জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের জন্য বিএনপিকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দল বা ‘ফেভারিট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই গণমাধ্যম এমন মূল্যায়ন তুলে ধরে।

‘দ্য নিউ বাংলাদেশ ইজ অনলি হাফ বিল্ট’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে দ্য ইকোনমিস্ট সরাসরি উল্লেখ করে, ‘বিএনপি জয়ের ফেভারিট।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে থাকা বিএনপি বর্তমানে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের পর এটিই দেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন। গত কয়েক মাস ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও এখন পর্যন্ত সেই শঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা আপাতত ভুল প্রমাণিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করে সাময়িকীটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচন মূলত দুটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে লড়াই। এই দুই দলই আগের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে উল্লেখ করে দলটিকে বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে মধ্যপন্থি ইসলামপন্থি সংগঠন’ হিসেবে আখ্যা দেয়। তবে সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে আবারও বলা হয়, এই নির্বাচনে বিএনপিই জয়ের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্ট সতর্ক করে বলেছে, শুধুমাত্র নির্বাচন আয়োজন করলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে না। দেশটি তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নতি করতে পারবে, যদি সংস্কারের প্রতি আগ্রহ ও উদ্যোগ ধরে রাখা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যেই দলই সরকার গঠন করুক না কেন, সামনে তাদের জন্য কঠিন ও ব্যাপক কাজ অপেক্ষা করছে।

বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে অর্থনীতির কথা তুলে ধরা হয়। দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে ‘বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।’ তবে একই সঙ্গে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি টেকসই করতে হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার জরুরি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। এর ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ হারাবে। এই প্রেক্ষাপটে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, বাংলাদেশকে তার শিল্পকারখানাগুলো আরও দক্ষ করতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে সরকারি রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের সরকারি রাজস্ব বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ, যেখানে এশিয়ার গড় হার প্রায় ২০ শতাংশ। এই ব্যবধান কমাতে না পারলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে বলে সতর্ক করে দেয় সাময়িকীটি।

দ্য ইকোনমিস্ট আরও বলেছে, দেশে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ এসব আমলা ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখে এবং বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।

প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, অনেক বাংলাদেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, যখন ভারতীয় কর্মকর্তারা ‘ভুলভাবে বাংলাদেশকে হিন্দুবিরোধী সহিংসতায় জড়িত দেশ হিসেবে তুলে ধরেন।’ এই ধরনের বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করা হয়।

এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করে দ্য ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান প্রশাসন ভারতের বিষয়ে ‘অতিরিক্ত খোঁচা দিতে আগ্রহী’ আচরণ করছে। আগামী সরকারকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে বলে মত প্রকাশ করে সাময়িকীটি।

প্রতিবেদনের শেষ অংশে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সংস্কারকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দ্য ইকোনমিস্টের মতে, এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক মাইলফলক। তবে একই সঙ্গে তারা মন্তব্য করেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া এখনই শুরু হলো মাত্র।